ঘরের মানুষই দলের শক্তি

ডেস্ক রিপোর্ট : বাংলাদেশের রাজনীতিতে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মসৃণ এক পথের নাম পরিবারচর্চা। ঘরের রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে উঠারা সহজেই জায়গা করে নিতে পারেন তৃণমূলের হৃদয়ে। দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষপদগুলোতেও এর ছায়া দেখা যায়। এর ব্যতিক্রম নয় সিলেটেও। মূলধারার রাজনীতিতে সিলেটেও অনেকে পরিবারের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে ছায়া দিচ্ছেন রাজনীতির ময়দানে। এদের কেউ এসেছেন পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে, কেউ এসেছেন স্বামীর হাত ধরে।

সিলেটে পারিবারিক পরিচয়ে রাজনীতির পতাকা ধরে আছেন অনেকেই। মূলত রাজনীতির মাঠে যারা প্রভাবশালী তাদের পরিবারের সদস্যরা পরবর্তীতে তাদের অনুসরণ করে এক পা এক পা করে এগিয়ে এসেছেন জনতার সামনে।

আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসীন আলীর পথ ধরে রাজনীতির মাঠে এসেছেন তার স্ত্রী সায়রা মহসীন। তিনিই এখন মৌলভীবাজারে আওয়ামী লীগের অন্যতম কাণ্ডারী। সৈয়দ মহসীন আলীর মৃত্যুর পর তার শূন্য আসনে দলের মনোনয়নে এখন তিনি সংসদ সদস্য। সায়রা মহসীনের মতো সিলেট থেকে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন আরো দুই নারী। তারা দু’জনেও পারিবারিক ঐতিহ্যের পথ ধরে রাজনীতির মঞ্চে এসেছেন। এর মধ্যে সুনামগঞ্জের দিরাই-শাল্লা থেকে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন জয়া সেনগুপ্তা। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের স্ত্রী। স্বামীর মৃত্যুর পর তার শূন্য আসনে দলের মনোনয়নে এখন সংসদ সদস্য। হবিগঞ্জের কোটায় সংরক্ষিত আসনে সংসদে সদস্য হয়েছেন এডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী। রাজনীতির মাঠে তিনি এসেছেন বাবার পদচিহ্ন ধরে। তার বাবা কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী, একমাত্র বেসামরিক ব্যক্তি যিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কমান্ড্যান্ট উপাধি পেয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান-মুক্তিযুদ্ধে সফল ভূমিকার পর বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক মানিক চৌধুরী সফলতার দেখা পেয়েছিলেন রাজনীতির মাঠেও।

সিলেটে আওয়ামী রাজনীতির বটবৃক্ষ সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ। দেশভাগের আগে রাজনীতিতে নাম লেখানো আবদুস সামাদ আজাদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহচর ছিলেন। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ কোথায় নেই আবদুস সামাদ আজাদ। বাবার আদর্শকে সামনে রেখেই পথ চলছেন আজিজুস সামাদ ডন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে নৌকা নিয়ে লড়তে চেয়েছিলেন, মনোনয়ন পাননি। তবে তার অনুসারীরা মানতে চাননি, নির্বাচনের মাঠে তারাই তাকে ঠেলে দিয়েছিলেন। অল্পের জন্য হার মানতে হয় আজিজুস সামাদ ডনকে। তবে মাঠ থেকে সরে যাননি তিনি। এলাকাবাসীর পাশে থাকতে সংসদকেই পাখির চোখ করেছেন তিনি।
সিলেটের আওয়ামী রাজনীতিতে আরো এক মহীরুহ দেওয়ান ফরিদ গাজী। তার পরিবারের সদস্যরাও রাজনীতির মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। এক ছেলে দেওয়ান কয়েস গাজী, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। আরেক ছেলে গাজী মো. শাহনেওয়াজ মিলাদ হবিগঞ্জে নেতৃত্ব দিচ্ছেন আওয়ামী রাজনীতির। হবিগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দৌড়েও আছেন তিনি। ফরিদ গাজীর জামাতা ডা. মোর্শেদ আহমদ চৌধুরীও সক্রিয় আছেন আওয়ামী রাজনীতিতে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন (বিএমএ)-এর কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ফরিদ গাজীর এক মেয়ে আমাতুজ জাহুরা রওশন জেবিন রুবা সিলেট জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, নির্বাচিত হয়েছেন জেলা পরিষদের সদস্য হিসেবেও।

সিলেটের রাজনীতিতে আরো একটি জাঁদরেল নাম হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। সাবেক এ স্পিকারের মেয়ে নাসরিন রশীদ করিমও রাজনীতির খাতায় নাম লিখিয়েছিলেন। তবে রাজনীতির মাঠে যখন নিজের অবস্থান পাকা করে নিচ্ছিলেন তখন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০১০ সালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

শাহ এএমএস কিবরিয়া। বাংলাদেশের ইতিহাসে সফল এক অর্থমন্ত্রী। ঘাতকের বোমার আঘাতে মৃত্যু না হলে এখনও হয়তো জাতীয় রাজনীতিতে দাপটেই বিচরণ করতেন তিনি। তার মৃত্যুর পর জনতার সামনে চলে আসেন তার স্ত্রী আসমা কিবরিয়া ও ছেলে ড. রেজা কিবরিয়া। শান্তির স্বপক্ষে মাঠে থেকে আমৃত্যু লড়াই করে গেছেন আসমা কিবরিয়া। সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে রেজা কিবরিয়াও নাড়িয়ে দেন সাধারণের হৃদয়। তাই রাজনীতির মাঠে সরব না হলেও রাজনীতি থেকে কেউই তাকে হিসাবের বাইরে রাখছেন না। হবিগঞ্জের আওয়ামী রাজনীনিতে বেশ ভালোই প্রভাব রেজা কিবরিয়ার।

সিলেটের রাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে প্রভাবশালী নামটি হচ্ছে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের। এখনও সিলেটের আওয়ামী রাজনীতিতে তার বিকল্প আর কেউই নেই। সিলেটের রাজনীতিতে প্রভাব রয়েছে তার পরিবারেরও। রাজনীতির মাঠে সদর্পেই বিচরণ করছেন তার ছোটভাই জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড. একে আবদুল মোমেন। আবুল মাল আবদুল মুহিত না দাঁড়ালে সিলেট-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হওয়ার ভালোই সম্ভাবনা রয়েছে তার। রাজনীতির মাঠে এখনও না নামলেও নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ক্রমেই পরিচিত হয়ে উঠছেন মুহিতপুত্র সাহেদ মুহিতও। আবুল মাল আবদুল মুহিতের ভাগ্নি জামাতা আহমদ আল কবীরেরও রয়েছে রাজনৈতিক পরিচয়। তিনি যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য।

সাইফুর রহমান। সিলেটের বিএনপি রাজনীতিতে বিশাল এক বটবৃক্ষ সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম. সাইফুর রহমান। বাবার আমলেই রাজনীতিতে নাম লেখান তার ছেলে নাসের রহমান। পিতা-পুত্র একসঙ্গে সংসদ সদস্যও ছিলেন। মৌলভীবাজারে বিএনপি রাজনীতিতে এখনও নাসের রহমানই নিয়ন্তা।
সিলেটের বিএনপি রাজনীতির আরেক প্রভাবক ছিলেন এম. ইলিয়াস আলী। ২০১৩ সালে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান বিএনপি’র এ কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। আর খোঁজ মেলেনি। তারপর থেকে ইলিয়াস আলীর শূন্যতা পূরণের দায়িত্ব নেন তার স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা। তিনি এখন দলের চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা। একই পদে থাকা খন্দকার আবদুল মোক্তাদিরও বয়ে চলেছেন উত্তরাধিকার রাজনীতি। তার বাবা খন্দকার মালিক ছিলেন সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য। শুধু বিএনপি-আওয়ামী লীগেই নয়। সিলেটে পারিবারিক রাজনীতি চর্চা রয়েছে জাতীয় পার্টিতেও। সাবেক খাদ্যমন্ত্রী মেজর ইকবাল হোসেন চৌধুরীর পর তার স্ত্রী বেগম মমতাজ ইকবালও নাম লেখান রাজনীতির খাতায়। সুনামগঞ্জ-৪ আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্যও হয়েছেন। সংসদ সদস্য থাকাবস্থায়ই ২০০৯ সালে তার মৃত্যু হয়। বাবা-মা’র পায়ের চিহ্ন ধরে এখন রাজনীতির পথে হাঁটছেন তাদের ছেলে ইনান ইসমাম হোসেন চৌধুরীও।

সুনামগঞ্জে রাজনীতির ক্ষেত্রে দেওয়ান আনোয়ার রাজা চৌধুরীর পরিবারের অবদানও কম নয়। দেওয়ান আনোয়ার রাজা ছিলেন সুনামগঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তার পরিবারের সদস্যরা বহুদলীয় গণতন্ত্রচর্চার আদর্শ তৈরি করেছেন। তার ভাই দেওয়ান তৈমুর রাজা চৌধুরী ছিলেন সিলেট জেলা বিএনপি’র সভাপতি, জিয়া সরকারের আমলে প্রতিমন্ত্রীও ছিলেন। আনোয়ার রাজা চৌধুরীর ছেলেদের মধ্যে দেওয়ান শামসুল আবেদীন চৌধুরী বিএনপি’র হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বিএনপি’র হয়ে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন আরেক ছেলে দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন চৌধুরী। আরো এক ছেলে আওয়ামী আদর্শের সৈনিক দেওয়ান মমিনুল মউজদীন ছিলেন সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র। আনোয়ার রাজা চৌধুরীর জামাতা সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ছিলেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, দল থেকে ছিটকে গেলেও রাজনীতিতে তার প্রভাব এখনও কমেনি। সুনামগঞ্জ আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য আবদুজ জহুরের পথ ধরে রাজনীতির মাঠে এসেছেন তার ছেলে ব্যারিস্টার এনামুল কবীর ইমন। যুবলীগের প্রেসিডিয়ামের সদস্য ও সুনামগঞ্জ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইমন ছিলেন সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের সদস্য। তারও চোখ এখন সংসদের দিকে।

উত্তরাধিকারের রাজনীতিতে সিলেটের জন্য সবচেয়ে বড় চমক হয়ে আসতে পারেন সাবেক নৌবাহিনী প্রধান ও সাবেক মন্ত্রী রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খানের মেয়ে জোবায়দা রহমান। তবে পিতার পায়ের চিহ্ন ধরে নয় রাজনীতির মাঠে তার অভিষেক হতে পারে জিয়া পরিবারের পুত্রবধূ হিসেবে। জোবায়দা রহমান বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের স্ত্রী। উত্তরাধিকারের পরিক্রমায় তিনিই একসময় হয়তো হয়ে উঠতে পারেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি’র কাণ্ডারী।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *